ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্তে বিলম্ব ঘটাতে পারে। অর্থনীতিবিদ ও বিনিয়োগকারীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে বাড়তে থাকা এ অস্থিরতা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দিতে পারে। এ অবস্থায় এখনই সুদহার বাড়ানোর পথে নাও হাটতে পারে মার্কিন আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড)। অভ্যন্তরীণভাবে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির উপাদানগুলোর গতিপ্রকৃতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভূরাজনৈতিক ও ভূঅর্থনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে সতর্ক পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের পরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সংস্থাটি। খবর সিএনএন।
ইরানের পরমাণু ও সামরিক স্থাপনায় শুক্রবার নজিরবিহীন হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল, ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার ফলে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, চলমান এ সংঘাত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে ফেলতে পারে। এটি যুক্তরাষ্ট্রে দ্রব্যসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণ হতে পারে।
সিটি গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বৈশ্বিক অর্থনীতিবিদ রবার্ট সকিন সতর্ক করে বলেন, ‘যদি এ সংঘাত আরো বাড়ে ও জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যায়, তাহলে তা হবে ফেডের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ। মূল্যস্ফীতির অনিশ্চয়তার কারণে ফেড সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্তে আরো ধীর গতি দেখাতে পারে।’
তিনি জানান, ফেড কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে তারা সুদের হার কমানোর জন্য তাড়াহুেড়া করছেন না। কারণ তারা জানেন না যে শুল্কের প্রভাব অর্থনীতিতে কেমন হবে। তবে যদি মূল্যস্ফীতির ওপর আরো ঝুঁকি বাড়ে, তাহলে সম্ভবত তারা শুধু বছরের শেষে সুদের হার কমানোর দিকে নজর দেবেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেডারেল রিজার্ভকে সুদহার কমানোর জন্য বারবার চাপ দিচ্ছেন। তবে ফেড কর্মকর্তারা তাদের সিদ্ধান্তে স্থির রয়েছেন। কারণ তারা ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা আগে দেখতে চাইছেন। ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতি, শুল্ক সমস্যা ও অভিবাসন নীতির পরিবর্তনগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। এ অবস্থায় ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্বাভাস দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন ফেডের কর্তাব্যক্তিরা।
ফেড আগে জানিয়েছিল, তারা ট্রাম্পের নীতির প্রভাব দেখতে চায়। এখন মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বাড়ার কারণে বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, তাড়াহুড়া না করে সুদহার প্রসঙ্গে আরো সতর্ক অবস্থান নিতে হবে ফেডকে।
আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিএনওয়াই মেলনের অ্যামেরিকার ম্যাক্রো স্ট্র্যাটেজিস্ট জন ভেলিস বলেছেন, ‘মুদ্রানীতি ভূ-রাজনৈতিক সংকটগুলো মোকাবেলা করতে প্রস্তুত নয়। তবে এ পরিস্থিতি ফেডকে আরো বেশি সতর্ক হতে বাধ্য করবে।’
বর্তমানে ফেড তাদের আর্থিক নীতির ক্ষেত্রে আরো আস্থাশীল ও সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করছে। তবে তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে অন্যান্য আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি।
এছাড়া এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার শক্তিশালী থাকার কারণেও ফেড সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে তাড়াহুেড়া করছে না। মে মাসে মার্কিন শ্রম বিভাগ জানিয়েছে, কর্মদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ১ লাখ ৩৯ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। এ সময় বেকারত্বের হার ছিল ৪ দশমিক ২ শতাংশ।
দেশটিতে প্রথমবারের মতো বেকারত্ব ভাতা নেয়ার আবেদনকারীর সংখ্যা কমেছে। এছাড়া এপ্রিলের শেষে চাকরিসংক্রান্ত সুযোগ বাড়ানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এর অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের চাকরি রয়েছে এবং ফেড এখনো কিছুটা সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ফেড যেহেতু দেখতে পাচ্ছে যে শ্রমবাজার স্থিতিশীল, তাই সুদের হার কমানোর জন্য তাদের কোনো তাড়াহুেড়া করার দরকার নেই। মার্কিন অর্থনীতি এখনো স্থিতিশীল রয়েছে। বর্তমানে শ্রমবাজার শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যে দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে বলে হয়তো আশঙ্কা করছেন ফেডের নীতিনির্ধারকরা।
ওয়েলস ফার্গো ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ জে ব্রাইসন বলেছেন, ‘যদি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরো খারাপ হয় এবং জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে, তবে মূল্যস্ফীতি আরো বৃদ্ধি পাবে।’
তিনি জানান, সম্ভবত গ্রীষ্মের শেষে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার কমে যেতে পারে। ফলে ফেড তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। ফেড যদি অর্থনীতির সংকট দেখতে পায়, তবে সুদের হার কমানোর জন্য তারা এগিয়ে আসতে পারে, যদিও জ্বালানি তেলের দাম বেশিই থেকে যাবে।
বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা অক্টোবরে সুদের হার কমানোর বিষয়ে আশা করছেন। এছাড়া তারা ফেডের নতুন পূর্বাভাসের জন্য অপেক্ষা করছেন, যা আগামী সপ্তাহে প্রকাশ হবে। ফেড তাদের সিদ্ধান্তে বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করবে, যেমন শ্রমবাজারের অবস্থা, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতা।